
আমাকে কেউ যদি কখনো জিজ্ঞাসা করে আমার প্রিয় গন্ধ কি, অনেক প্রিয় গন্ধের মধ্যে একটি অবশ্যই থাকবে মাছের ঝোলের গন্ধ। তবে মায়ের হাতের নয়, আমার ছোট মাসিমণির হাতের রাঁধা ছোট মাছের ঝোলের গন্ধ। ছোটবেলা থেকেই মাছ আর দুধ আমার খুব প্রিয়। আগের জন্মে নিশ্চয়ই বেড়াল ছিলাম। এই প্রসঙ্গে এটাও বলে রাখি যে আমার ছোট মাসির বাড়িতে অন্তত ৮ থেকে ১০ টি পোষা বেড়াল ছিলো। আমার ধারণা আমিও সেই দলেই পড়তাম দীর্ঘদিন। মাসি বিয়ে করেন নি, থাকতেন দিদা ও মামাদের সাথে বেহালা তে, দাদুর তৈরি করা জায়গা-বহুল বাড়িতে।মামাদের একমাত্র ভাগ্নি হিসেবে আমাকে দরকার এর চেয়ে বেশিই আদর দেওয়া হতো। কিন্তু, যেহেতু আমার বাবার বদলির চাকরি ছিল, আমার ছোটবেলার অনেকটা অংশ কলকাতার বাইরেই কেটেছে। তাই মামা-মাসির আদর ছিল দুর্লভ এবং সেই কারণেই ওই মাছের ঝোলও ছিল দুর্লভ ও বহুকাঙ্ক্ষিত।
লোকে বলে মা এর হাতের রান্না অতুলনীয়। আমার মার হাতের রান্নাও আমার কাছে খুব প্রিয় তবে মায়ের রান্না আমার চিরকাল প্রিয় ছিল না। মায়ের রান্নার বিবর্তনের পেছনে একটা মজার গল্প আছে।
আমার মা পুষ্টিকর খাবারের জন্য সর্বদা সচেতন থাকতেন। ছোটবেলা থেকে ‘হেলথি’ খাওয়াবেন বলে মা বাড়িতেই সব বানাতেন। সব মানে সব - রান্নার মশলা, টমেটো সস , স্ট্রিট ফুড, সাউথ-ইন্ডিয়ান ফুড, হেলথ ড্রিঙ্কস,এমন কি মুড়িও। বাবার চাকরি সূত্রে ভূপালে ছিলেন দীর্ঘদিন, তাই অবাঙালি খাবার দাবার ও প্রচুর বানাতেন, তবে সেই হেলথ কন্ডিশন প্রযোজ্য ছিল সবেতেই। তাই আমার ’ টেস্ট বাড’ টাও ওরমই তৈরি হয়েছিল।
খুব ভালো কথা, ছেলে মেয়েদের স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়াবেন, কিন্তু ওই চক্করে মা আমার প্রিয় মাছের ঝোলের আত্মা কেড়ে নিয়েছিলেন। হালকা করে ভাজা মাছ, অলমোস্ট সেদ্দ, পাছে বেশি তেল খাওয়া পড়ে, আলু গুলোও ওরমই হালকা ভাজা, সাদা ট্যালট্যালে ঝোল। এক ফোঁটা হলুদ এর হদিশ পাওয়া যাচ্ছে কি যাচ্ছে না। তাতে ভাসছে মায়ের প্রিয় ছোট মাছ- বাটা। ঝোলের ওই রং দেখে, আমার আর আমার দাদার মুখের রং ও ওই ঝোলের মতনই ফ্যাকাশে হয়ে যেত। কী করনিও ? মা প্রচণ্ড রাগি ছিলেন, একটুও ফাঁকি দেওয়া যাবে না। একবার ভাবলাম মাসির উদাহরণ দেব। পরিণাম বিস্ফোরক হতে পারে ভেবে চেপে গেলাম। ভয়ে সোনা মুখ করে খেয়ে নিলাম।
এবার আসি স্কুল এর টিফিন বাক্সের কাহিনী তে। আমরা মেদিনীপুর থেকে নব্বইর দশকে, কলকাতায় আসি। বাবা আমাদের পড়াশোনার সুবিধার জন্য কলকাতায় একটি ফ্ল্যাট কিনে আমাকে ও মাকে একটা ব্যবস্থা করে দেন। দাদা পুরুলিয়া তে হোস্টেল এ আর বাবার পোস্টিং ওড়িশা তে। কাছেই একটা স্কুল এ আমায় ভর্তি করা হয়েছিল যাতে আমায় একা বেশি দূর যাতায়াত না করতে হয় । এই স্কুলেই আমি চিরকাল পড়েছি। ৫ থেকে ১২ ক্লাস অবধি।
সারাদিন পড়াশোনার পর যখন স্কুল এ টিফিন ব্রেক হতো, ওই সময় টিফিন খুলে কোন সারপ্রাইজটা লুকিয়ে আছে দেখার জন্যে আমার মন আনচান করতো। সব বন্ধুরা নানান রকম খাবার আনতো। আমিও অপেক্ষা করতাম, কিছু স্পেশাল থাকবে টিফিন বক্সে। সেই গুড়েও বালি ছিলো । কারণ মা আমার হেলথ ইন্সপেক্টর। তবে একবার যেন এর ব্যতিক্রম ঘটতে যাচ্ছিলো…
একবার এরম টিফিন ব্রেকএ টিফিন খুলে দেখি মা নুডলস দিয়েছেন। মনে আনন্দ আর ধরে না সেই দিন। রুটি তরকারি নয়, পোহা নয়, উপমা নয়, ফল নয়, মা দিয়েছেন নুডলস? এ তো অবিশ্বাস্য।
খুবই প্রফুল্লতার সঙ্গে কাঁটা চামচ দিয়ে অতীব গর্বের সাথে যেই না খেতে বসেছি, অমনি দেখি, নুডলস এর মধ্যে চাপা ঢাকা পটল বাবাজি, দাঁতের মতন বীজগুলো সমেত হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে। দেখে যতটা আনন্দে আশ্চর্য হয়েছিলাম, ততটাই হতাশায় মনটা ডুকরে কেঁদে উঠলো, চাপা ঢাকা পটলগুলো দেখে।কেন ? নুডলস এ কেউ পটল দেয়? হ্যাঁ ! আমার মা দিতেন।
স্বাদ সামঞ্জস্য বলেও কিছু হয়, এইটা মায়ের বোধগম্য ছিল না বলেই আমার ধারণা ছিল। মিথ্যে কথা বলবো না, ওই সময় ছোটোমাসির কথা খুব মনে পড়তো। মাসিমণি অনেক যত্ন করে খাওয়াতেন। আমার মার যুক্তি, ‘নুডলস এর সাথে সব কিছুই খেতে ভালো লাগে’। যাক, আমার যা বয়স ছিল তখন, মার সাথে তর্ক করার স্পর্ধা বা ইচ্ছে কোনোটাই ছিল না। আমার পাশে বসত আমার প্রিয় বান্ধবী, চয়নিকা । আজ ও সে প্রিয় এবং খুব ঘনিষ্ঠ। ওর টিফিন ভরা থাকতো আমার প্রিয় খাবারে- রোলস, স্যান্ডউইচ, ম্যাগি, পাটিস, ইত্যাদি। আমার মায়ের হাতের অতি যত্নে তৈরী খাবারের অরুচি মেটাতে আমি, আমার বান্ধবীর খাবারে ভাগ বসাতাম। আমার ভাগ্য খুব ভালো ছিল যে আমার বান্ধবী খুব স্বল্পাহারি ছিল এবং খুব উদার মনে ওর টিফিনটা আমায় দিয়ে দিতো। আমিও তৃপ্তি সহকারে সেই খাবার খেতাম। হ্যাঁ ! আমি খুবই পেটুক মেয়ে ছিলাম। এইসব গপ্পো বাড়িতে জানতে পারলে ঠ্যাং খোঁড়া করে দিতেন মা। আমার মিলিটারি মেজাজ এর মাকে আমি ও দাদা দুজনেই ভীষণ ভয় পেতাম। চশমা পড়লে তো আরোই। আমার দাদা, মায়ের একটা গুপ্ত নামকরণও করেছিল - ‘সিংহবাহিনী’ I বলা বাহুল্য এভাবেই দিন কাটছিলো।
মায়ের ভালোসার ধরন অন্য রকম ছিল, ওই রাগ এর মধ্যি লুকিয়ে থাকতো আদর। এক হাতে সংসার সামলে, মেজাজটা বিশেষ আয়ত্তে রাখতে পারতেন না। আমি বুঝতাম সেটা। তবে রাতে শোবার সময়, মা একদম অন্যরকম। কোলবালিশের মতন আমায় জড়িয়ে নিয়ে শুতেন।
এরকমই একটি রাতে শুয়ে আছি, হঠাৎ মা উঠে বসলেন বুকে হাত দিয়ে। আমায় বললেন পিঠটা ডলে দিতে। মা এর মুখ দেখে বুঝেছিলাম খুবই কষ্ট হচ্ছিলো। প্রায় ১৫ মিনিট অস্বস্তির পর, মা আবার শুয়ে পড়লেন। পরের দিন আবার সেই একই ঘটনা। মাঝ রাতে উঠে বসা আর বুকে পিঠে ব্যথা।
পরের দিনই জেনারেল মেডিসিন-র ডাক্তার এর কাছে যাওয়া। অ্যান্টাসিড দিলেন। সাময়িক কমলো কিন্তু আবার সেই রাত জেগে ব্যথা হতে থাকলো । সব রকম ডাক্তার দেখানোর পর অবশেষে যখন একজন হার্ট স্পেশালিস্ট এর কাছে যাওয়া হলো, উনি হার্ট এর কোনো সমস্যা নাকচ করে দিয়ে বললেন,‘আপনি একটা আলট্রাসাউন্ড করান তো’। ইতি মধ্যে বাবা চলে এসেছিলেন। মা কে আলট্রা সাউন্ড করানো হলো। ধরা পড়লো গলব্লাডারে স্টোন । একটা নয়, দশটা নয় , পুরো ৪৬ টা স্টোন, একই রকম দেখতে, সিমেট্রিক পাথর। ওগুলোকে দেখে আমার সেই পটলের বীজের কথা মনে পড়ে গেলো। তবে কি ওই পটলের বীজ গুলোই এখানে এসে জমাট বেঁধেছে?
পেট কেটে অপারেট করতে হয়েছিল মায়ের । সব শেষে মাকে যখন চাক্ষুষ দেখানো হলো স্টোন গুলো, মা হতভম্ব। এতো হেলথি খেয়ে এই পরিণাম ? ডাক্তার সব শুনে বললেন - ’ যে খাবার দেখে জিভে জল আসে, সেই খাবার খেলেই পাচন ভালো ভাবে হবে’ আর বললেন অতিরিক্ত মাইল্ড খাবার খেলে বাইল জুস রিলিজ হয় না গল ব্লাডার থেকে , ফলত ব্যবহার না হওয়ার দরুন, সেই পাচন রস পাথর এ পরিবর্তিত হয়’
সেই থেকে মা ছলছলে চোখে নিজেকে আর আমাদের কথা দিলেন যে আর ট্যালট্যালে ঝোল বানাবেন না। আমরা সবাই হেসে হাততালি দিতে শুরু করলাম। মা, মাসি, মামারা সবাই হেসে উঠলো। আমি মাসির দিকে তাকিয়ে মিচকে হাসলাম। PS: এখন তো সনোগ্রাম খুবই সাধারণ ব্যাপার। মায়ের গলস্টোনে ধরা পড়তে অনেক হয়রান হতে হয়েছিল। ডাক্তার ধরতেই পারছিলো না। মায়ের এই হয়রানি হবার পর মা দাদা কে ডাক্তারি পড়তে বলেন। দাদা তাই ডাক্তারি পরে ভবিষ্যতে। যাক পটলের অনেক অবদান আছে আমাদের জীবনে তাহলে।
আমার মায়ের তৈরি প্রিয় খাবারের মধ্যে পড়ে - বাঁধাকপির পোলাও, চিকেন চাপ, দই মাছ, নানান রকম ভাজা, ইলিশ এর ডিম্ এর টক এবং রকমারি রান্না। তবে আমার প্রিয় ছোট মাছের ঝোলটা ছোটোমাসির ই বরাদ্দ থাক। আমার ছোটোমাসি আজ আর জীবিত নেই, রয়েছে সেই ছোটবেলার অসংখ্য স্মৃতি ।