শৈশবের পুজোর আনন্দ ছিলো একটু আলাদা । আমার বাড়ির দুর্গাপুজো আনুমানিক সাড়ে তিনশো বছরেরও পুরনো । যখন ছোট ছিলাম দেখতাম মহালয়ার দিন ভোরবেলা রেডিও তে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ শুনে বাবা স্নান সেরে পট আঁকতে শুরু করতেন । আমাদের বাড়ির পুজো অবশ্য প্রথা মেনে হতো । তাই পুজোর আনন্দ যেমন ছিলো তেমনই ছিলো কঠোর নিয়মানুবর্তীতা । তিথি ক্ষণ মেনেই নির্ধারিত সময়ে সমস্ত কিছু হতো । আর ছিলো মামাবাড়ির দুর্গাপুজো । সেখানে অবশ্য মাটির প্রতিমা । তাই খড়ের কাঠামোর উপরে মাটির প্রথম প্রলেপ দেয়ামাত্রই পুজোর আনন্দে আমরা মেতে উঠতাম । বাড়িতে কত রকমের নাড়ু তৈরি হতো, মন্দিরের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে রাত জেগে পুজোর আয়োজন , ঢাকের বাদ্যি, সানাই এর আওয়াজ, কাঁসর ঘণ্টা উলুধ্বনি, ধুনোর গন্ধে চারিদিক মেতে উঠতো ।
ফিনল্যান্ডে আসার পরে পুজোর ওই দিনগুলোতে খুব মন খারাপ করতো । তবে বাড়ির আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে দেখা না হলেও, পুজোর সময় প্রবাসী বাঙালিরা সবাই একসাথে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এখানে যে পুজোর আয়োজন করে চলেছেন তার আনন্দও যে কোনও অংশে কম নয় সে কথা অস্বীকার করার উপায় নেই ।
প্রতি বছর এখানে এই পুজোর দিনগুলো আমরা বেশ মজা করে পার করি । আগে অংশগ্রহণ করতাম ঠিকই তবে এই বছরের পুজোতে কিছু বিশেষ দায়িত্বভার কাঁধে নেয়ার ফলে হয়তো সবার সাথে আলাপের সুযোগ আরও বেড়েছে । বলতে অসুবিধে নেই, যাঁরা নিজেদের অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্য থেকেও সময় বের করে কী সুন্দর হাসি ঠাট্টার মধ্য দিয়ে পুজোর আয়োজন করে চলেছেন, তাঁদের একটাই উদ্দেশ্য, পরিবার কে ছেড়ে প্রবাসে এসে বাঙালি পুজোর এই কয়েকটা দিন অন্তত নিজের সংস্কৃতিকে যেন আবার ফিরে পায় । সমালোচনা ও সেই সঙ্গে মতবিরোধ হতেই পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে আমরা যে আনন্দময়ীর আগমনী বার্তা কে সবার কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি, এই আমাদের চরম সাফল্য ।
আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও কিন্তু এই মহান উদ্যোগে অংশগ্রহণ করে তাদের মতো করে পুজোর দিনগুলি সাজিয়ে নিয়েছে । তাদের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, আনন্দকে তাদের খুঁজে পেতে হয় না, তারা যেখানেই থাকে আনন্দ সেখানেই বিরাজমান । বড়দের মতো এতো ভাবার তাদের সময় নেই । তাই শিশু মনের ভাবের ঘরে কোনও ফাঁকিও নেই । সবশেষে বলি, এখানে হয়তো কাশফুল বা শরতের শুভ্র মেঘের দেখা মেলে না, নেই শিশির ভেজা শিউলি ফুলের গন্ধ । তবে আমাদের উমা এখানেও ঘরের মেয়ে হয়ে এসে পুজোর কটা দিন আমাদের সাথে পরমানন্দে কাটিয়ে যান । তাঁর আলতা পড়া রাঙা পায়ের ছাপ রেখে যান প্রবাসী বাঙালির স্বযত্নে সুরক্ষিত স্মৃতিপটে ।
শুভ শারদীয়া!