এই পথ যদি না শেষ হয়
তবে কেমন হতো তুমি বলো তো?
যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়
তবে কেমন হতো তুমি বলো তো।

বলছি, শুনুন তাহলে –

পুজো তখনও অনেক দূর। ক্যালেন্ডারের পাতায় শরতের কোনও আভাস নেই। কলকাতার আকাশে তুলোর মতো মেঘ নেই, কাশফুল নেই, ঢাকের শব্দও নেই। বরং উত্তর ইউরোপের গ্রীষ্ম তখন নিজের ছন্দে দিব্যি ব্যস্ত। তবু জুলাইয়ের এক সকালে মনে হল, এবারের পুজোর আনন্দটা একটু আগেই শুরু করা যাক। গন্তব্য ঠিক করা হল অনেক দূরে—ইউরোপের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে। সঙ্গে নিজেদের গাড়ি, তিনজনের সংসার, আর সামনে অজস্র অচেনা রাস্তা। আজ, শারদীয়ার জন্য সেই সফরের কথা লিখতে বসে অবশ্য মনে হচ্ছে—পুজোর আনন্দ আর পথের আনন্দের মধ্যে বোধহয় কোথাও একটা গোপন আত্মীয়তা আছে।

সে কথায় পরে আসছি।

১৪ জুলাই সকাল ন’টার ফেরি হেলসিঙ্কি থেকে তালিনের দিকে ছাড়ল। গাড়িটা ফেরির পেটে, আর আমরা ডেকে দাঁড়িয়ে। পিছনে ফিনল্যান্ড, সামনে এস্তোনিয়া। তখনও জানি না, পরের এগারো দিনে এই গাড়িটাই হয়ে উঠবে আমাদের দিনের সঙ্গী, বিশ্রামঘর, মোবাইল রেস্তোরাঁ, গান শোনার জায়গা, কখনও ছোটখাটো ঝগড়ার মঞ্চ, আবার কখনও জানলার বাইরে ছুটে চলা ইউরোপকে দেখার অভিজ্ঞতা।

আমাদের সামনে প্রায় ছ’হাজার কিলোমিটার রাস্তা। সংখ্যাটা শুনলে একটু ভয় পাওয়ারই কথা। কিন্তু তখন সে সব নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। ভাবটা ছিল—চলেই দেখি না!

তালিন পেরিয়ে এস্তোনিয়া, তারপর লাটভিয়া। রাস্তার দু’পাশে সবুজের সমুদ্র। এক দেশ কখন শেষ হয়ে আর এক দেশ কখন শুরু হয়ে গেল, অনেক সময় বোঝাই গেল না। সীমান্তে বিশাল কোনও গেট নেই, কাঁটাতারের বেড়া নেই। একটা সাইনবোর্ড, অন্য গাড়ির নম্বরপ্লেট, আর মোবাইলের নেটওয়ার্ক অপারেটরের নাম বদলে গিয়ে মাঝে মাঝে শুধু জানিয়ে দিল—আচ্ছা, আমরা আবার অন্য দেশে ঢুকে পড়েছি!

প্রথম রাতের ঠিকানা লিথুয়েনিয়ার কাউনাস। সারাদিন ধরে দেশ-দেশান্তর পেরিয়ে অবশেষে রাতের খাবার কিনে আমরা ১০ টা নাগাদ কাউনাসে পৌঁছোলাম। সেদিন আবার ফ্রান্স বনাম স্পেন এর বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল বলে কথা, তাই গিয়ে না গিয়েই প্রথম কাজ ছিল খেলা দেখা। সারাদিনের ক্লান্তিতে, ঢুলু-ঢুলু চোখেই স্পেনের ফ্রান্সকে দুরমুশ করাটা বেশ ভালোভাবেই উপভোগ করলাম।

পরের দিন সকাল-সকালই বেরিয়ে পড়লাম আশেপাশে জায়গাগুলো দেখতে। old town এর সরু গলি, গির্জার চূড়া, পাথর-বিছানো রাস্তা—কাউনাসের মধ্যে একটা শান্ত, পুরনো দিনের মেজাজ আছে। তারই মধ্যে চোখে পড়ল এক অদ্ভুত মজার ভাস্কর্য—একজন মানুষ যেন মাটি থেকে খানিকটা ওপরে দিব্যি ভেসে আছেন! প্রথম নজরে মনে হয়, মহাশয় বোধহয় নিউটনের মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম মানতে একেবারেই রাজি নন। পুরনো শহরের ইতিহাসের মধ্যে এমন একটু চোখ-ধাঁধানো আধুনিক রসিকতা বেশ ভালোই লাগল। কাছ থেকে দেখেও প্রথম মুহূর্তে রহস্যটা ঠিক ধরা পড়ে না—লোকটা দাঁড়িয়ে আছেন, বসে আছেন, না সত্যিই হাওয়ায় ঝুলছেন!

কিন্তু সময় আমাদের খুব একটা বেশি ছিল না। আবার গাড়ি ছুটিয়ে আমাদের গন্তব্য পোল্যান্ডের ক্রাকোভ এ পৌঁছতে হবে যে। রাস্তা অনেকটা। গাড়ির জানলার বাইরে দৃশ্যপট একটানা বদলাতে থাকে—কখনও শহর, কখনও ছোট্ট গ্রাম, কখনও যতদূর চোখ যায় কৃষিজমি। একটা সময় মনে হয়, আজকের দিনটা যেন কোনও শহরের জন্য নয়, শুধু রাস্তার জন্যই বরাদ্দ।

ক্রাকোভে পৌঁছে অবশ্য ক্লান্তি অনেকটাই উধাও। সেই পুরনো শহর, মার্কেট স্কোয়ার, ইতিহাস যেন এখানে মিউজিয়ামের ভিতরে আটকে নেই, রাস্তায় নেমে মানুষের সঙ্গে হাঁটছে। সেদিন আবার বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমী ফাইনাল ছিল, আর্জেন্তিনা বনাম ইংল্যান্ড। যেহেতু ক্লান্তিটা অনেকটাই কেটে গেছিল, সুতরাং আমি আমার ছেলের সঙ্গে, একেবারে বড় পর্দায় মেসি ম্যাজিক উপভোগ করলাম। বুড়ো হাড়েও যে কত স্কিল থাকতে পারে, সেটা হাড়ে-হাড়ে টের পাইয়ে দিয়েছিল মেসি কোম্পানি সেদিন।

কিন্তু ক্রাকোভের সবচেয়ে বড় চমকটা আমাদের জন্য শহরের মধ্যে অপেক্ষা করছিল না, সেটা ছিল তার পরের দিনের রাস্তায়। ক্রাকোভ থেকে জাকোপানের পথে। জাকোপানের কথা প্রথম শুনেছিলাম এক বন্ধুর কাছে। তাই যাওয়ার ইচ্ছেটাও ছিল বেশ জোরালো, তারপর একটু ইন্টারনেটে খোঁজ-খবর নেওয়াতে ওটাকে আমরা বাকেট লিস্টের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নিলাম। পথ যত এগোয়, সমতল পোল্যান্ড ধীরে ধীরে পাহাড়ের দিকে উঠে যেতে থাকে। দূরে তাত্রা পর্বতমালার আভাস দেখা দেয়। রাস্তার এক একটা বাঁক পেরোলেই দৃশ্য বদলে যাচ্ছে। কোথাও মনে হচ্ছে গাড়ি থামিয়ে শুধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি। সেদিন আরও একবার বুঝলাম ভ্রমণের সৌন্দর্য সবসময় গন্তব্যে অপেক্ষা করে না। অনেক সময় গন্তব্যে যাওয়ার পথে কোনও অচেনা বাঁকের পরে হঠাৎ যে দৃশ্যটা সামনে এসে দাঁড়ায়, সেটাই বহুদিন মনে থেকে যায়। জাকোপানের পাহাড়ি হাওয়া, রাস্তার ধারের ছোট ছোট দোকান, দূরে পাহাড়ের সারি—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, ইউরোপের মানচিত্রের উপর দিয়ে নয়, যেন কোনও ছবির ভিতর দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি, যাকে বলে একেবারে scenic drive।

জাকোপানে থেকে তারপর স্লোভাকিয়া পেরিয়ে হাঙ্গেরির দিকে। বুদাপেস্টের কাছাকাছি Érd-এ আমাদের রাতের ঠিকানা। সারাদিন গাড়ি চালানোর পরে শরীর বলছিল, “আজ থাক।” কিন্তু মন বলল, “এত কাছে এসে রাতের Parliament house টা একবার দেখব না?” অগত্যা মন শরীরের ক্লান্তিকে হার মানিয়ে দিলো। লোভ সামলাতে না পেরে রাতেই চলে গেলাম আমরা পার্লামেন্ট হাউস দেখতে। শুনেছিলাম, রাতের আলোয় হাঙ্গেরির Parliament Building নাকি অসাধারণ লাগে। গিয়ে বুঝলাম, কথাটা মোটেই বাড়িয়ে বলা নয়। ডানিউবের কালো জলের ধারে আলোয় ঝলমল করা বিশাল ভবনটা দেখে হঠাৎ মাইসোর প্যালেসের কথা মনে পড়ে গেল। দুই জায়গার স্থাপত্য সম্পূর্ণ আলাদা, কিন্তু আলোয় সাজানো কোনও বিশাল ঐতিহাসিক ভবন যে একইরকম শিশুসুলভ বিস্ময় তৈরি করতে পারে, সেটা সেদিন আবার টের পেলাম। তবে বিস্ময় যতই থাক, সারাদিনের ড্রাইভিংটাও তো সত্যি। তাই বেশি রাত না করে ফিরে এলাম।

পরদিন আমাদের হাতে বুদাপেস্টের জন্য ছিল শুধু সকালটা। ডানিউব, বুদা আর পেস্ট, চেন ব্রিজ, সংসদ ভবন, ফিশারম্যানস বাস্টিয়ন—একদিকে রাজকীয় আবার অন্যদিকে প্রাণবন্ত। ডানিউবের ধারে হাঁটতে হাঁটতে অবশ্য শহরটার একেবারে অন্য মুখের সামনে এসে দাঁড়ালাম। সংসদ ভবনের খুব কাছেই নদীর পাড়ে সারি দিয়ে রাখা কয়েক জোড়া লোহার জুতো—পুরুষের, মহিলার, ছোট্ট শিশুরও। দূর থেকে দেখলে প্রথমে মনে হয়, কেউ বুঝি জুতো খুলে নদীর ধারে বসে আছে। কাছে গিয়ে বোঝা যায়, এ কোনও সাধারণ শিল্পকর্ম নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে এই ডানিউবের ধারেই বহু ইহুদি মানুষকে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। মৃত্যুর আগে তাঁদের জুতো খুলে রাখতে বলা হত—যুদ্ধের সময় জুতোও তখন মূল্যবান সম্পদ। আজ সেই ফেলে যাওয়া জুতোর স্মৃতিই লোহার ছাঁচে দাঁড়িয়ে আছে নদীর ধারে।

শহরটাকে ঠিকমতো জানতে গেলে বেশ কয়েক দিন চাই, কিন্তু আমাদের হাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা, কারণ সামনে আবার রাস্তা।

পরের গন্তব্য স্লোভেনিয়া। আর সেখানেই এই সফরটা যেন হঠাৎ অন্য একটা রঙ পেল। স্লোভেনিয়ার দিকে যেতে যেতে পাহাড় যত কাছে আসতে লাগল, গাড়ির ভিতরের কথাবার্তাও তত কমে গেল। সবাই যেন নিজের নিজের জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতে ব্যস্ত। আমি অবশ্য ড্রাইভার সিটে বসে সারাদিন খালি বাইরেই তাকিয়ে আছি।

তারপর এল সেই দিন। Šum Waterfall → Lake Bled → Lake Bohinj। কীভাবে লিখব সেই পথের কথা? কিছু দৃশ্যকে বিশেষণ দিয়ে বেঁধে ফেলতে গেলেই বরং তাদের ছোট করা হয়। পাহাড়ের গায়ে মেঘ। ঘন সবুজের ফাঁক দিয়ে নীল আকাশ। কোথাও জলপ্রপাতের শব্দ, কোথাও ছবির মতো ছোট্ট গ্রাম। রাস্তা কখনও পাহাড়ের গা ঘেঁষে, কখনও জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে।

ছবিতে লেক ব্লেড অনেকবার দেখেছি, লোকের মুখে শুনেওছি। কিন্তু ছবি আর বাস্তবের মধ্যে যে এতটা ফারাক থাকতে পারে, সেখানে না দেখলে বুঝতাম না। নীল-সবুজ জল। তার মাঝখানে ছোট্ট দ্বীপ। দ্বীপের উপর গির্জা। পিছনে পাহাড়। কিছুক্ষণ সত্যিই কারও বিশেষ কথা বলার ছিল না। শুধু তাকিয়ে থাকা। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, এত কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে যদি শুধু এই দৃশ্যটার জন্যও আসতাম, তাহলেও বোধহয় আফসোস থাকত না।

তারপর Lake Bohinj-এর রাস্তা। Bled যদি সাজানো ছবির মতো সুন্দর হয়, Bohinj যেন একটু গম্ভীর, একটু নিঃশব্দ। লোকজন কম, প্রকৃতি আরও কাছে। রাস্তা যেন পাহাড়ের সঙ্গে নিজের মতো কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছে। সেদিন একটা কথা খুব মনে হয়েছিল যে ভ্রমণের ছবি আমরা হাজারটা তুলতে পারি, কিন্তু কোনও ছবিই ঠিক সেই মুহূর্তের বাতাস, শব্দ, গন্ধ কিংবা হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়ার অনুভূতিটা ধরে রাখতে পারে না। সেগুলো থেকে যায় অন্য কোথাও।

স্লোভেনিয়ার Domžale-তে আমাদের দু রাত। একটু বিশ্রাম, একটু ঘোরাঘুরি। গাড়িটাও তখন বেশ বিশ্বস্ত সহযাত্রী হয়ে উঠেছে। ২০২১-এর Ioniq PHEV—পাহাড়, মোটরওয়ে, শহর, লম্বা ড্রাইভ, সীমান্ত—কোনও অভিযোগ নেই। কিন্তু মানুষের যন্ত্রপাতি তো Hyundai-র কারখানায় তৈরি নয়! এতক্ষণে আমার কোমরের নীচের অংশ বেশ জোরালো প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছে। এদিকে গাড়ি বলছে, “আরও কয়েকশো কিলোমিটার হয়ে যাক!” আর কোমর বলছে, “তুই একাই যা!”

শেষ পর্যন্ত দু’জনের মধ্যে কে জিতেছিল, সেটা এই লেখার শেষ পর্যন্ত পড়লেই বোঝা যাবে।

এবার উত্তরমুখী হওয়ার পালা। স্লোভেনিয়া থেকে অস্ট্রিয়া পেরিয়ে চেক প্রজাতন্ত্র। পথে পাহাড় আর সারিসারি টানেল। আমরা এর আগে অস্ট্রিয়াতে ঘুরেছি কিন্তু যা টুকটাক বাকি ছিল, সেটা এই যাত্রায় কভার করার চেষ্টা করলাম। যেমন ধরুন গ্রাজ এন্ড লিন্জ শহর, এই দুটো শহরই প্রাগের পথে যেতে পড়ে। প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়ালের সাক্ষী হয়েছিলাম সেদিন। অস্ট্রিয়ায় একটি টানেলে ঢোকার কিছু আগে এমন প্রবল বৃষ্টি শুরু হল যে বাধ্য হয়ে রাস্তার ধারের একটি বিশ্রামস্থলে গাড়ি থামাতে হল। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও বৃষ্টির তেমন বিরাম নেই দেখে শেষ পর্যন্ত সেই বৃষ্টির মধ্যেই আবার পথ ধরলাম। কিন্তু আশ্চর্য কাণ্ড—টানেল পেরিয়ে ওপারে বেরোতেই দেখি ঝকঝকে আকাশ আর কাঠফাটা রোদ! কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আবহাওয়ার এমন নাটকীয় বদল দেখে আমরা সবাই একেবারে হতবাক। যেন টানেলের এক প্রান্তে এক ঋতু, আর অন্য প্রান্তে সম্পূর্ণ অন্য এক পৃথিবী!

প্রাগের কাছে Říčany তে আমাদের দু রাতের আস্তানা। আর এখানে এসে আমাদের সফরের সঙ্গে আরেকটা বড় উৎসব জুড়ে গেল—ফুটবল বিশ্বকাপ। আমাদের যাত্রা শুরু হওয়ার সময় থেকেই FIFA World Cup-এর সেমিফাইনালের উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। আর Říčany-তে পৌঁছনোর প্রথম রাতেই ছিল ফাইনাল, ১৯ এ জুলাই।

সারাদিন গাড়ি চালিয়ে নতুন দেশে এসে নিজেদের থাকার জায়গায় ব্যাগ নামিয়েই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলাম ডিনার করতে। আর নাকেমুখে কোনো রকমে একটা কিছু গুঁজে ঘরে ফিরে এসেই আমরা বসে পড়লাম বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে। বাইরে শান্ত শহরতলি। আমাদের গাড়ি পার্কিংয়ে বিশ্রামে। আর ঘরের ভিতর টিভির পর্দায় পৃথিবীর অন্য প্রান্তে ফুটবল নিয়ে তুমুল উত্তেজনা। রাত দেড়টা অবধি চলল সেই পাগলামি। তারপর লামিনের কেরামতি, তোরেসের অসাধারণ গোল, আর্জেন্তিনার অসহায়তা, এনজোর রেড কার্ড, আর অবশেষে স্পেনের বিশ্বজয় উপভোগ করে দিনটা শেষ হল। ভ্রমণের মাঝখানে এমন অপ্রত্যাশিত ছোট ছোট স্মৃতিই পরে সবচেয়ে বেশি মনে থাকে।

পরদিন প্রাগ দর্শন। কিন্তু তার আগে একবেলার জন্য চেক সীমান্ত পেরিয়ে ঢুঁ মেরে এলাম জার্মানির Dresden শহরে। Elbe নদীর ধারে দাঁড়িয়ে Dresden-এর দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে একটা অদ্ভুত সংযম। শহরটা সুন্দর, কিন্তু নিজের ইতিহাস ভুলে গিয়ে সুন্দর হওয়ার চেষ্টা করেনি। স্থাপত্যের দেয়ালে, নদীর ধারে, পুরনো ভবনগুলোর মধ্যে ইতিহাসের ছাপ রয়ে গেছে।

আর আমাদের গাড়ি? সে তখনও বিশ্রাম নিতে শেখেনি। তবে বেশিক্ষণ থাকা হল না। আবার প্রাগে ফিরে এলাম। এই শহরটা যেন একই সঙ্গে কয়েকটা আলাদা সময়কে ধরে রেখেছে। একদিকে Vltava নদীর উপর বহু শতাব্দীর পুরনো Charles Bridge—দু’পাশে মূর্তি, সামনে প্রাগের লাল ছাদের সারি। ব্রিজের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখনও নদীর দিকে তাকাই, কখনও দূরে পাহাড়ের মাথায় Prague Castle-এর দিকে। Prague Castle-এ পৌঁছে মনে হয় পুরো শহরটাই যেন নিচে খুলে রাখা একটা বিশাল মানচিত্র। গির্জার সুউচ্চ চূড়া, পুরনো প্রাসাদ, পাথরের উঠোন—ইতিহাস এখানে বেশ আড়ম্বর করেই নিজের উপস্থিতি জানায়।

তারপর আবার প্রাগের অন্য রূপ। Vltava-র ধারে দাঁড়িয়ে থাকা Dancing House। প্রথম দেখায় মনে হল, দুটো বাড়ি বুঝি সত্যিই কোমর ধরে নাচতে নেমেছে! চারপাশের পুরনো, গম্ভীর স্থাপত্যের মধ্যে এই বাঁকানো-চোরা আধুনিক বাড়িটা যেন শহরের মুখে হঠাৎ একটা দুষ্টু হাসি। Old Town, Astronomical Clock, Charles Bridge, Prague Castle, Dancing House, Vltava, সব মিলিয়ে প্রাগকে একটা শব্দে ধরা মুশকিল। কখনও রূপকথা, কখনও ইতিহাস, কখনও আবার একেবারেই আধুনিক।

তারপর পরদিন উত্তরমুখী দীর্ঘ যাত্রা। এবার আবার পোল্যান্ড—সুদূর উত্তরের Gdańsk-এর দিকে। রাতের ঠিকানা Warzenko। এই দীর্ঘ রাস্তাগুলোয় একটা কথা বারবার মাথায় আসছিল। মানচিত্রে দেশগুলোর সীমানা কী স্পষ্ট! একেকটা দেশ একেক রঙে আঁকা। অথচ বাস্তবের রাস্তায় সেই সীমানা কতটাই না অস্পষ্ট। কখনও একটা সাইনবোর্ড জানিয়ে দিল যে দেশ বদলে গেছে। তারপর? একই আকাশ। একই রাস্তা। একই গাছ। একই রোদ। মানুষই সীমানা টানে। পথ বোধহয় টানে না।

Gdansk থেকে ফেরার পথে আবার লিথুয়ানিয়ার Šiauliai-তে এক রাত। তারপর লাটভিয়া পেরিয়ে আবার এস্তোনিয়া।

এবার সত্যিই মনে হচ্ছিল, গল্পটা শেষের দিকে এগিয়ে আসছে। Põltsamaa-তে রাত কাটিয়ে পরদিন Tartu। তারপর Haapsalu, তারপর Paldiski। এতদিনে কত কিছু দেখা হয়ে গেছে—পাহাড়, লেক, নদী, দুর্গ, পুরনো শহর, মোটরওয়ে, টানেল। অথচ শেষদিনের এস্তোনিয়ার রাস্তারও যেন নিজস্ব একটা আনন্দ ছিল। বাল্টিকের পরিচিত ঠান্ডা হাওয়া। ছোট শহর। কম গাড়ি। দূরে সমুদ্র। Paldiski থেকে তালিনের দিকে গাড়ি ঘোরানোর সময় প্রথম সত্যি মনে হল—এবার বাড়ি ফিরছি।

অদ্ভুত ব্যাপার, এগারো দিন আগে তালিনে ফেরি থেকে গাড়ি নামানোর সময় মনে হয়েছিল সামনে কত পথ! আর এখন সেই একই শহরের দিকে ফেরার সময় মনে হচ্ছে—এত তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে গেল? শেষবার গাড়ি উঠল ফেরির পেটে। তালিন থেকে হেলসিংকি। ওডোমিটারের হিসেব বলছে—৬০৮১ কিলোমিটার।

এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়েনিয়া, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া, অস্ট্রিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, জার্মানি। কত রাস্তা, কত শহর, কত অচেনা নাম। কোথাও পাহাড়, কোথাও নদী, কোথাও মধ্যযুগের শহর, কোথাও আধুনিক মোটরওয়ে। একবার Lithuania থেকে Poland ঢোকার সময় সীমান্তে কাগজপত্র পরীক্ষা করতে পনেরো-কুড়ি মিনিট লেগেছিল। দু’একটা অতিরিক্ত টোল দিতে হয়েছে। বাকিটা আশ্চর্যরকম ভাবে নির্বিঘ্ন। গাড়ি একবারও বিগড়োয়নি। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে insurance company-কে ফোন করতে হয়নি। আর এগারো দিনের শেষে তিনজনেই নিরাপদে বাড়ি ফিরেছি। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?

ফেরির ডেকে দাঁড়িয়ে সেদিন হঠাৎ মনে হল, পুজোর সঙ্গে এই ভ্রমণের মিলটা বোধহয় এখানেই। পুজোর আনন্দ কি শুধু ষষ্ঠী থেকে দশমীর মধ্যে আটকে থাকে?

থাকে না তো। অনেক আগেই শুরু হয়ে যায় তারিখ গোনা দিয়ে। কে কোথায় যাবে, কার সঙ্গে দেখা হবে, কী পরা হবে, কোথায় খাওয়া হবে, এইসব পরিকল্পনায়। ঠিক যেমন প্যান্ডেল হচ্ছে এটা দেখাতেও আনন্দ আছ, আবার তেমনই নতুন জামার প্যাকেট খুলে আবার গুছিয়ে রাখাতেও আনন্দ আছে। তারপর চার-পাঁচটা দিন চোখের পলকে কেটে যায়। দশমীতে মনখারাপ হয়। কিন্তু সত্যিই কি সব শেষ হয়ে যায়?

আমাদের এই সফরটাও তো অনেকটা তেমন। Lake Bled সুন্দর ছিল ঠিকই, কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর আগের উত্তেজনাটাও কম ছিল না। সামনে কী অপেক্ষা করছে জানা নেই—এই কৌতূহল। পরের বাঁকের ওপারে পাহাড় থাকবে, না ছোট্ট কোনও গ্রাম, না আরও একশো কিলোমিটার সোজা রাস্তা, সেটাও আনন্দ।

পুজোয় যেমন আনন্দ শুধু প্রতিমা দেখায় নয়, অপেক্ষার মধ্যেও; ভ্রমণেও আনন্দ শুধু গন্তব্যে নয়, পৌঁছনোর পথটুকুতেও।

এখন গাড়িটা আবার বাড়ির সামনে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। ওডোমিটারে ছ হাজারের একটু বেশি কিলোমিটার যোগ হয়েছে। কোমরও ধীরে ধীরে নিজের পুরনো মতামত প্রত্যাহার করেছে। তবু মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করলেই এখনও একটা রাস্তা ভেসে ওঠে। সামনে পাহাড়। একপাশে নীল জল, আর কোথাও হয়তো কোনও অচেনা শহর আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। পথ থেমেছে ঠিকই, কিন্তু পথের আনন্দ তো থামেনি। সে শুধু অপেক্ষা করছে আবার কোনও একদিন আমাদের ডাকবে বলে।

আর তখন মনে হয়—

এই পথ যদি না শেষ হয়…