প্রতি বছরের মতোই আমরা ফিনল্যান্ডের বাঙালিরা মেতে উঠেছি পুজোর আনন্দে বছরের মাঝ থেকেই। সারা বছর অনেকেই এই দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে, এমনকি আমাদের নতুন প্রজন্ম, যারা ফিনল্যান্ডে জন্মছে ও বড় হয়েছে। আমাদের কাছে পুজো এতো প্রিয় কি আমরা ধার্মিক বলে? নাহঃ, বাঙালির দুর্গাপুজো, ধর্মের বেড়াজাল পেরিয়ে বহুযুগ আগেই আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বড়দিনের উৎসবে যেমন ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালি সেইন্ট পল’স এর গির্জায় বা পার্ক স্ট্রিট এ ভিড় করে, ঠিক তেমনি, পাড়ায়-পাড়ায় জাত-ধর্ম-নির্বিশেষে, বাঙালি-অবাঙালি, দুর্গাপুজোয় মেতে ওঠে সংস্কৃতি-পুজোতে। বাঙালির সংস্কৃতি মানে নাচ-গান-কবিতা শুধু নয়, সংস্কৃতি মানে - পাড়ার ক্লাবের তাস-ক্যারাম পেটা থেকে শুরু করে কাদামাখা ফুটবল আর পেটকাটা চাঁদিয়াল! সংস্কৃতি মানে - রকে বসে গুলতানি আর বিড়ির ধোয়া চেপে - “কাকু ভালো আছেন তো?”. . . সংস্কৃতি মানে - চাঁদা তুলতে বেরিয়ে অনেক রাত অবধি আড্ডা মেরে বাড়িতে বকা খাওয়া। পাড়ার ক্লাবে, নাটকের রিহার্সালে লুকিয়ে চোখেচোখে প্রেম মাখা। সংস্কৃতি মানে - অষ্টমীর দুপুরের পাত পেরে খিচুড়ি আর রোজ বাড়ি-বাড়ি প্রসাদ দেয়া। ইলিশ আর কষা মাংসের স্বাদে পুজোর দিনে আঙ্গুল চাটা। পুজোর সংস্কৃতি মানে জাত-ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালির ধমনী দিয়ে বয়ে চলা রক্তকণিকাদের এক সুরে মিলেমিশে কথা বলা। বিভিন্নতার মাঝে সমবেতর উচ্ছাসের এর থেকে বড়ো পরিচয় বোধহয় পৃথিবীতে মেলা দুষ্কর। তাই আমাদের বাচ্চারাও মুখিয়ে থাকে দুর্গাপুজোর দিনকটার জন্য এই সুদূর প্রবাসে। নিজেদের আনন্দের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ধমনীতে, শিরায় শিরায় বাঙালির এই সংস্কৃতির ছাপ গেথে দেওয়া।
বিগত ২৭ বছরের পথচলার মধ্যে দিয়ে আমরা এক বড় পরিবারে পরিণত হয়েছি। আমাদের পুজো এবারে ফিনল্যান্ডের লিভিং হেরিটেজ এর লিস্টে সংযোজিত হয়েছে, বছরের পর বছর আমাদের সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও স্বেচ্ছাসেবিতার মাধ্যমে। প্রথম ভারতীয় এসোসিয়েশন হিসেবে এই স্বীকৃতি আমাদের আমাগী দিনে পথ চলার পাথেয়।
আজকের ফিনল্যান্ডে, আমাদের নিজেদের সঠিক অবস্থান খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। পৃথিবীতে ‘অভিবাসী’ শব্দটা এক ভয়ঙ্কর শব্দ হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। আমরা যারা এখানে কর্মসূত্রে এসেছি, যাদের জীবনসঙ্গীরা নিজেদের ও সন্তানদের জন্য একটি সুন্দর জীবন গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন - আমাদের নিজেদের “অভিবাসী” না হয়ে “পেশাজীবী” হিসেবে তুলে ধরা অত্যন্ত প্রয়োজন। কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং উগ্র ডানপন্থী মেরুকরণের ফলে ফিনল্যান্ডে বিদেশিদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা চলছে; এর প্রভাব আজ যেমন আমাদের ওপর পড়ছে, তেমনি ভবিষ্যতেও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তা আরও জোরালোভাবে অনুভূত হবে! ঠিক এই কারণেই দুর্গাপূজার আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক সত্ত্বাকে উদযাপন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংযুক্ত করে ভারতীয় ও বাঙালি সম্প্রদায় সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। পেশাগত জীবনের বাইরেও সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজের মূলধারার সাথে একাত্ম হওয়ার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল মনোভাব প্রকাশ করতে হবে। এটি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে করা এক অঙ্গীকার - যা যেকোনো মূল্যে আমাদের পূরণ করতেই হবে!
আমাদের বেঙ্গলি এসোসিয়েশন অফ ফিনল্যাণ্ড তৈরির অনেক আগে থেকেই এই আমাদের অঙ্গীকার, এই অঙ্গীকার বহন করার গুরু দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই আমাদের ২৭ বছরের পথ চলা। দায়বদ্ধতার পরিচয় থাক কাজে, শুধু কথায় নয়। সময়ের ডাকে, সব ভেদাভেদ ভুলে - এস, আমরা সবাই উৎসবের আনন্দ মাতোয়ারা হই, “সৃজন”- সুখের উল্লাসে।

ইন্দ্র
১৮.১০.২০২৬