
আমার ছোটবেলার পুজো মানেই ছিল এক অন্যরকম আনন্দ। তখন আমরা একান্নবর্তী পরিবারে থাকতাম—জেঠু, কাকা, বাবা, মা আর আমরা ভাই-বোনেরা সবাই একসঙ্গে। ফলে পুজো আসার অনেক আগে থেকেই বাড়িতে শুরু হয়ে যেত এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।
পুজোর আনন্দ শুরু হত জামাকাপড় কেনা দিয়ে। কে কটা জামা পেল, কোন জামাটা ষষ্ঠীতে পরবে, কোনটা সপ্তমীতে, অষ্টমীর জন্য কোনটা তুলে রাখা হবে—তারও আবার আলাদা পরিকল্পনা! নতুন জামাগুলো বারবার খুলে দেখা, গায়ে দিয়ে দেখা, তারপর যত্ন করে তুলে রাখা—যেন পুজো আসার আগেই অর্ধেক আনন্দ হয়ে যেত।
আর জেঠুর ছিল আমাদের পুজোর Chief Planner-এর দায়িত্ব। ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী—কোন দিন কোথায় ঠাকুর দেখতে যাব, কখন বেরোব, কী খাব, কে কতটা খাবে—সবকিছুরই নিখুঁত হিসেব থাকত। ফুচকা হলে কে কটা ফুচকা পাবে, কার পেটের ক্ষমতা কতটা—সেটাও বাদ যেত না!
তবে আমাদের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দিন ছিল সেই দিন, যেদিন আমাদের রাত দশটা পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকার অনুমতি মিলত। শর্ত একটাই—আমাদের সঙ্গে বড়দাদাকে অবশ্যই থাকতে হবে!
সেই দিন মানেই বাগবাজারের পুজো। ঠাকুর দেখা তো হতোই, তার সঙ্গে মেলার যাবতীয় আনন্দ—হাতে ঘোরানো নাগরদোলা, ঘূর্ণি, কত কী! সবকিছুতেই চড়তে হবে, সবকিছু দেখতে হবে, আর মাঝেমধ্যে অবশ্যই কিছু না কিছু খাওয়া চাই।
আর সেই রাতের শেষ আকর্ষণ ছিল—জৈন শিল্পের হজমি গুলি কেনা। এত বেশি করে কিনতাম, যেন সারা বছর ধরে অল্প অল্প করে খাওয়া যায়! তখন মনে হতো, পুজোর আনন্দটা যেন বাড়িতে ফিরেও আমাদের সঙ্গে থেকে যাবে। আর এই সব আনন্দের মাঝেই একদিন ঘটেছিল আমার সেই বিখ্যাত “ফিশ ফ্রাই” কাণ্ড।
জেঠু ঘোষণা করলেন, একদিন সবাই ফিশ ফ্রাই খাব। তবে একটা শর্ত—সবাইকে “ফিশ ফ্রাই” একেবারে ঠিক করে বলতে হবে। তখন আমি খুব ছোট, সামনের বেশ কয়েকটা দাঁত পড়ে গেছে। ফলে কথা বললেই অনেকটা হাওয়ার মতো বেরিয়ে আসত।
প্রথমে ছোটজনকে জিজ্ঞেস করা হল। সে বলল, “ফিশ ফ্রাই।” জেঠু বললেন, “ঠিক হলো না!”
এরপর আমার পালা। আমি ভাবলাম, যেহেতু ও ভুল বলেছে, আমি আরও জোর দিয়ে ‘র’ উচ্চারণ করব। খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললাম—
“ফ্রিশ ফ্রাই!”
ব্যস! সবাই হেসে গড়াগড়ি!
শেষে দিদি একেবারে ঠিক করে বলল—“ফিশ ফ্রাই।” আর পুরস্কার হিসেবে ফিশ ফ্রাই পেল দিদিই! আমি সেদিন ফিশ ফ্রাই খেতে পারিনি। কিন্তু সেই ঘটনা আমাকে ছোটবেলাতেই দুটো বড় শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিল—কোনও শব্দ শুধু শুনলেই হবে না, তার বানানটাও মনে রাখতে হবে। আর পুজোর ফিশ ফ্রাই যেন জীবনে আর কখনও মিস না হয়! তবে এত বছর পরেও সত্যিটা হল—সেই না-পাওয়া ফিশ ফ্রাইয়ের আফসোসটা আজও কোথাও একটু রয়ে গেছে।