ধরুন আপনি একটি গাছের নিচে বসে আছেন। গাছটা কি ‘সত্যিই’ সেখানে আছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা সাধারণত দু-সেকেন্ডও ভাবি না - অবশ্যই আছে, চোখে দেখছি, ছায়া পাচ্ছি, ডাল ভাঙলে ব্যথা পাব। কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান আর আধুনিক নিউরোসায়েন্স মিলে এই নিশ্চিন্ত উত্তরটাকে একটু কাঁপিয়ে দিয়েছে।
দার্শনিক মিশেল বিতবল বলেছেন, ‘পৃথিবী এমন যে তুমি নিজেকে তার থেকে আলাদা করতে পারবে না।’ কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার ফুকস এর সঙ্গে যোগ করেছেন যে সম্ভাবনা বা প্রবাবিলিটি পৃথিবীতে বাইরে কোথাও পড়ে নেই - এটা আসলে কারও জানার একটা মাপ, একটা সম্পর্কের প্রকাশ। আর নিউরোসায়েন্টিস্ট অনিল শেঠের ভাষায়, আমরা যা দেখি - মগ, বিড়াল, সোফা, গাছ - সবই মস্তিষ্কের ‘সেরা অনুমান’। আমাদের অভিজ্ঞতা, আমাদের স্মৃতি, আমাদের বিশ্বাসের ফিল্টারে ছাঁকা একটি সৃষ্টি। বাস্তবতা আমাদের ভেতরে আর বাইরে, দুই জায়গাতেই একসঙ্গে থাকে।
এই ধারণার নাম দেওয়া হয়েছে প্লুরিভার্স। মাল্টিভার্স যেমন বলে সমান্তরাল মহাবিশ্ব আছে, প্লুরিভার্স বলে ভিন্ন কথা - বাস্তবতা আসলে বহু দৃষ্টিভঙ্গির, বহু সম্পর্কের, বহু অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত জাল। এটা কোনো আগে থেকে তৈরি মঞ্চ নয় যার উপর দিয়ে আমরা হেঁটে যাই। এটা সেই মঞ্চ যা আমরা হেঁটে হেঁটে, কথা বলতে বলতে, একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক পেতে পেতে তৈরি করি। একসঙ্গে।
এই সূত্র ধরেই ভাবা যেতে পারে বাঙালিয়ানা শব্দটির কথা। এটাও কি তেমনই কিছু? বাঙালিয়ানা কি একটি স্থির বস্তু - কোনো সংজ্ঞায় লেখা, ইতিহাসের পাথরে খোদাই করা? নাকি এটা একটা প্লুরিভার্সের মতো - প্রতিটি বাঙালির দেখায়, অনুভবে, সম্পর্কে, প্রতিদিন নতুন করে তৈরি হওয়া একটা বাস্তবতা?
বাঙালিয়ানা: একটি তরল ধারণা
পহেলা বৈশাখ এলেই একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি দেয়: আমরা কি সত্যিই বাঙালি, নাকি বছরে একটা দিন বাঙালি সেজে নিই? শাড়ি পরি, ইলিশ খাই, রবীন্দ্রসংগীত ছেড়ে রাখি ফোনে - তারপর পরের দিন থেকে আবার সেই চেনা রুটিন। তাহলে বাঙালিয়ানা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?বাঙালিয়ানা কোনো পাথরে খোদাই করা জিনিস নয়; এটা বদলায়, ভাঙে, নতুন রূপ নেয়। হেলসিঙ্কি, জেনেভা বা শিকাগোতে থাকা প্রবাসী বাঙালি যেভাবে বাঙালিয়ানা আঁকড়ে ধরে, কলকাতার ফ্ল্যাটবাড়ির এলিট পরিবারের সঙ্গে তার মিল খুব কম। গ্রামের চাষি, শহরের মধ্যবিত্ত, বস্তির কিশোর - তিনজনের বাঙালিয়ানা তিন রকম। তাহলে ‘আসল’ বাঙালিয়ানাটা কোনটা?
এই প্রশ্নের উত্তরে প্লুরিভার্সের ধারণাটা একটা আলো দেয়। প্লুরিভার্স বলে, কোনো একটি ‘সঠিক’ বা ‘আসল’ বাস্তবতা নেই যা সবার জন্য এক। বাস্তবতা তৈরি হয় অনেক কেন্দ্র থেকে, অনেক সম্পর্ক থেকে। প্রতিটি বাঙালির বাঙালিয়ানাও তেমনি তার নিজের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, পরিবেশ আর সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া একটি বাস্তবতা। অনিল শেঠ যেমন বলেন, আমাদের উপলব্ধি একটি ‘নিয়ন্ত্রিত হ্যালুসিনেশন’ - মস্তিষ্কের পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোয় বাইরের জগৎকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা - তেমনি প্রতিটি বাঙালি তার বাঙালিয়ানাকে তার নিজের ইতিহাস, পরিবার আর পরিবেশ দিয়ে ব্যাখ্যা করে। আর তাই কোনো দুজনের বাঙালিয়ানা হুবহু এক নয়।
বাঙালিয়ানা ‘আবহমান’ বলে দাবি করা একধরনের রোমান্টিকতা - বাস্তবে এটি শ্রেণি, ক্ষমতা ও ইতিহাসের দ্বারা নির্মিত। বাঙালিয়ানাকে ‘চিরন্তন’ বা ‘আবহমান’ বলে পূজা করায় একটা বিপদ আছে। কারণ এতে যা হয়, তা হলো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির, নির্দিষ্ট রুচির সংস্কৃতিকেই ‘আসল বাঙালিয়ানা’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয় - বাকি সব কণ্ঠস্বরকে প্রান্তিক করে দিয়ে।
মধ্যবিত্তের বাঙালিয়ানা: কার ছবি, কার জন্য?
আমরা যে বাঙালিয়ানার কথা বলি, সেটা মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্তের নির্মাণ। রবীন্দ্রনাথ, টিপ, শাড়ি, ইলিশ, কবিতা - এই ছবিটা কে আঁকল? কলেজ-পাশ শহুরে বাঙালি। কিন্তু গ্রামের নাপিতের মেয়ে, বস্তির রিকশাচালক, চা-বাগানের শ্রমিক - তাঁদের গান, তাঁদের উৎসব, তাঁদের জীবনযাপন এই ছবিতে কোথায়? এটা কেবল ‘বাদ দেওয়া’ নয়, এটা অনেক সময় সক্রিয় উপেক্ষা।এখানেই প্লুরিভার্সের ধারণাটা আরও জরুরি হয়ে পড়ে। প্লুরিভার্স বলে, বাস্তবতা তৈরি হয় অনেক কেন্দ্র থেকে, অনেক দৃষ্টিকোণ থেকে - কোনো একটি কেন্দ্র থেকে নয়। কিন্তু বাঙালিয়ানার ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা হচ্ছে। একটিমাত্র কেন্দ্র থেকে ছবি আঁকা হয়েছে - মধ্যবিত্ত, শহুরে, উচ্চশিক্ষিত - আর বাকি সব কেন্দ্রকে সেই ছবির কোণায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্র যখন ‘লোকসংস্কৃতি’ প্রচার করে - বিশ্বকাপের সময় বাউল গান বাজায়, দূতাবাসে নকশিকাঁথা ঝোলায় - তখন সেই সংস্কৃতির মানুষগুলো নিজেরা কতটা উপকৃত হন? প্রায়ই খুব কম। রাষ্ট্র-নির্মিত বাঙালিয়ানা আসলে একটি ‘জাতীয়তাবাদী ছবি’ - সীমানা রক্ষার কাজে লাগে, কিন্তু ভেতরের বৈচিত্র্যকে সম্মান করে না। শহুরে মধ্যবিত্তের ‘বইপড়া’ বাঙালিয়ানা প্রায়ই রুটি-রুজির মতো বাস্তব সমস্যাকে উপেক্ষা করে, যেন সংস্কৃতির আলোচনাটা জীবনের আলোচনা থেকে আলাদা কোনো বিলাসিতা।এটা বোঝার জন্য বেশি দূর যেতে হয় না। যে বাউলের গান আমরা উৎসবে মঞ্চে তুলি, সে বাউল হয়তো তার ভিটা হারিয়েছে। যে নকশিকাঁথার শিল্পীকে আমরা পুরস্কার দিই, সে হয়তো ন্যায্য মজুরি পান না। বাঙালিয়ানার এই ফাঁকটা না দেখলে, পুরো আলোচনাটাই একটু ফাঁপা হয়ে যায়।
দুই বাংলা, দুটি বাস্তবতা - একটি সুর
পহেলা বৈশাখের দিকে তাকালে প্লুরিভার্সের ধারণাটা হাতেনাতে বোঝা যায়। বাংলাদেশে এই দিনটা একটা বড় উৎসব; মঙ্গল শোভাযাত্রা, মেলা, খিচুড়ি, শাড়ি-পাঞ্জাবি, টিপ-কাজল। রাস্তায় মানুষে ভরা, উৎসাহে টইটম্বুর। পশ্চিমবঙ্গে উদযাপন তুলনামূলকভাবে নরম, পরিবারের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, নতুন বছরের পরিকল্পনা। দুটো আলাদা বাস্তবতা, দুটো আলাদা ‘বাঙালিয়ানা’।এই পার্থক্য কেন? কারণ দুটো দেশের ইতিহাস আলাদা, রাষ্ট্রের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক আলাদা। বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি জাতীয় মুক্তির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত - ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন আর ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। ফলে পহেলা বৈশাখ সেখানে কেবল একটি উৎসব নয়, একটি রাজনৈতিক বিবৃতিও - আমরা বাঙালি, আমরা আছি। পশ্চিমবঙ্গে সেই টান ভিন্ন রঙের - হিন্দি ও ইংরেজির চাপ আছে, বাংলা সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার একটা নিরন্তর লড়াই আছে।
কিন্তু এখানেই প্লুরিভার্সের সবচেয়ে সুন্দর দিকটা দেখা যায়। প্লুরিভার্স বলে, বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে তৈরি বাস্তবতাগুলো পরস্পরকে বাতিল করে না। এগুলো একটি ‘মেশওয়ার্ক’ বা জালের মতো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ঢাকা আর কলকাতার পহেলা বৈশাখ ভিন্ন, কিন্তু দুটোর মধ্যে একটি অদৃশ্য সুর মিলে যায়, যা কোনো রাজনৈতিক সীমান্ত মুছতে পারে না। সেই সুরটাই বাঙালিয়ানার গভীরতম স্তর।
“পৃথিবী এমন যে তুমি নিজেকে তার থেকে আলাদা করতে পারবে না।” মিশেল বিতবলের এই কথাটা বাঙালির ক্ষেত্রেও অদ্ভুতভাবে সত্য। হেলসিঙ্কিতে বসে বাংলা গান শোনা বাঙালি, ঢাকার রমনায় শোভাযাত্রায় হাঁটা কিশোরী, কলকাতার ফ্ল্যাটে রবীন্দ্রনাথ পড়া বৃদ্ধ - তিনজন তিন জায়গায়, তিন বাস্তবতায়। কিন্তু প্রত্যেকে বাঙালিয়ানা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। এটা তাদের যাপনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে - ভাষায়, গানে, খাবারে, স্মৃতিতে।
ভাষা: পরিচয় নয়, সত্তার ঘর
বাংলা ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি বাঙালির চিন্তার ছাঁচ, অনুভবের বাহন, সত্তার ঘর। এই অর্থে ভাষা কেবল পরিচয়ের চিহ্ন নয় - এটি সত্তার অংশ।
দর্শনের একটি ধারা আছে যার নাম এনঅ্যাক্টিভিজম। এই ধারার কথা হলো, জ্ঞান কোনো নিষ্ক্রিয় প্রতিফলন নয়। একটি জীব তার পরিবেশের সঙ্গে ক্রমাগত মিথস্ক্রিয়ায় জগৎকে নতুন করে তৈরি করে। জানা আর করা আলাদা নয় - এরা একসঙ্গে ঘটে। বাঙালি আর বাংলা ভাষার সম্পর্কটা ঠিক এইরকম। ভাষা বাঙালিকে গড়েছে, বাঙালি ভাষাকে গড়েছে - এই দুটো আলাদা নয়, এরা একসঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। বাঙালি যখন বলে ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ - এই শব্দগুলি শুধু একটি দৃশ্যকে বর্ণনা করে না। এগুলি একটি বিশেষ ঐতিহ্যের স্মৃতি জাগায়, একটি সুরকে মনে করিয়ে দেয়, একটি আবেগের সঙ্গে সংযুক্ত করে - যা শুধু বাংলায় কথা বলা মানুষই অনুভব করতে পারে। অনুবাদে এই অনুভবের পুরোটা যায় না।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এই সত্যকে রক্তের অক্ষরে প্রমাণ করেছে। সেই তরুণরা কোনো রাষ্ট্রীয় পরিচয় রক্ষার জন্য মরেননি। তাঁরা মরেছিলেন এমন কিছুর জন্য যা তাঁদের সত্তার সঙ্গে একাকার ছিল। ভাষা তখন পরিচয় ছিল না, সত্তা ছিল। সেই আত্মদানের পর বাংলা ভাষা আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম রইল না, এটি হয়ে উঠল একটি জাতির অস্তিত্বের প্রমাণ। আজও এই সত্তার টান অনুভব করা যায়। প্রবাসী বাঙালি যখন বহু বছর পর দেশে ফেরে, সে প্রথমে যা করে তা হলো বাংলায় কথা বলে - হাঁফ ছাড়ে, যেন অনেকক্ষণ জলের নিচে থেকে ওপরে উঠে বুকভরা শ্বাস নিল। এই অনুভবটাই বলে দেয়, ভাষা শুধু পরিচয় নয়, এটা শ্বাস।
‘শুদ্ধ’ বাঙালিয়ানা বলে কিছু নেই
আমরা অনেক সময় ভাবি, ‘আগে বাঙালিয়ানা ভালো ছিল, এখন নষ্ট হয়ে গেছে।’ কিন্তু 'আগে’টা কোন সময়? পলাশির যুদ্ধের আগে? সেন রাজাদের আমলে? পাল বংশের সময়? প্রতিটি যুগেই বাঙালি সংস্কৃতি কোথাও না কোথাও থেকে নিয়েছে, কাউকে না কাউকে দিয়েছে। এটাই তার জীবনীশক্তি। ঢাকা ও কলকাতার সংস্কৃতি সবসময়ই হাইব্রিড; মুঘল স্থাপত্যের ছাপ, ব্রিটিশ শাসনের ভাষিক প্রভাব, পোর্তুগিজ রান্নার ছোঁয়া, আরবি-ফারসি শব্দের মিশেল। আমাদের খাবারে, পোশাকে, সংগীতে, সবখানে এই মিশ্রণ। কোনো ‘খাঁটি’ বা ‘শুদ্ধ’ বাঙালিয়ানা কখনো ছিল না। এবং এটা দুর্বলতা নয়, এটাই বাঙালিয়ানার শক্তি।
এটা প্লুরিভার্সের মূল ধারণার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। প্লুরিভার্স বলে, বাস্তবতা সবসময় সম্পর্কের মধ্যে, মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে তৈরি হয় - কখনো বিচ্ছিন্নভাবে নয়। তেমনি বাঙালিয়ানাও সবসময় অন্যের সঙ্গে যোগাযোগে, সংঘর্ষে, মিলনে তৈরি হয়েছে। মুঘল দরবারে বাংলা কবিতা লেখা হয়েছে, ব্রিটিশ আমলে বাংলা গদ্যের জন্ম হয়েছে, স্বাধীনতার পর বাংলা চলচ্চিত্র নতুন ভাষা পেয়েছে - প্রতিটি ধাপে বাঙালিয়ানা নিজেকে নতুন করে গড়েছে। তাই বিপদটা অন্য জায়গায়। যখন আমরা একটা নির্দিষ্ট সময়ের, একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির বাঙালিয়ানাকে ‘মানদণ্ড’ ধরে বাকিদের বিচার করতে বসি - তখন সংস্কৃতি আর মুক্তির জায়গা থাকে না, নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে যায়। বাঙালিয়ানা যদি শুধু একটা মানদণ্ডের শাসন হয়, তাহলে সেটা আর জীবন্ত সত্তা নয়, সেটা একটা খাঁচা।
তরুণ প্রজন্ম ও বৈশ্বিক টান
আজকের তরুণরা জাপানি অ্যানিমে, কোরিয়ান ড্রামা আর ইংরেজি পডকাস্ট নিয়ে বড় হচ্ছে। বাংলা উপন্যাস পড়ার চেয়ে নেটফ্লিক্স দেখা বেশি সহজ, বাংলা গান শোনার চেয়ে স্পটিফাই বেশি হাতের কাছে। এ নিয়ে অনেক বড়দের গলায় আক্ষেপ শোনা যায়, বাঙালিয়ানা শেষ হয়ে যাচ্ছে।কিন্তু এই আক্ষেপটা কি ঠিক? সংস্কৃতি কখনো বদলানো থামেনি। প্রতিটি প্রজন্মই নতুন কিছু টেনে নেয়, পুরনো কিছু ছেড়ে দেয়। এনঅ্যাক্টিভিজমের ভাষায় বললে, জীব তার পরিবেশের সঙ্গে ক্রমাগত মিথস্ক্রিয়ায় নিজেকে নতুন করে তৈরি করে। কোরিয়ান ড্রামা দেখা বাঙালি কিশোরী বাঙালিয়ানা হারাচ্ছে না, সে তার বাঙালিয়ানাকে একটি নতুন পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে পুনর্গঠন করছে। এটাই স্বাভাবিক, এটাই জীবন্ত সংস্কৃতির লক্ষণ। তবে একটা সতর্কতার জায়গা আছে। সংস্কৃতি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া মানে সংস্কৃতি রক্ষা নয়। রাষ্ট্র যদি বলে তোমাকে বাংলা গান শুনতে হবে, তাহলে সেই গান বোঝা হয় না, অনুভব করা হয় না। বাঙালিয়ানা টিকে থাকে ভালোবাসায়, বাধ্যবাধকতায় নয়। যে শিশু মায়ের কাছে রবীন্দ্রনাথের গল্প শুনে বড় হয়, সে বড় হয়ে নিজেই খুঁজে নেয় রবীন্দ্রনাথকে - কেউ বাধ্য না করলেও।
বাঙালির একটা পুরনো স্বভাব আছে - সে আইডিয়া নিয়ে তর্ক করতে ভালোবাসে, পণ্ডিত মানুষকে সম্মান করে, মজা করে ‘বুড়ো’ বলে ডাকলেও। এই স্বভাবটা এখনো যায়নি। চায়ের দোকানে রাজনীতি নিয়ে তর্ক, ফেসবুকে সাহিত্য নিয়ে বিতর্ক, ইউটিউবে বাংলা কবিতার ভিডিওতে লক্ষ ভিউ - এগুলো বলে, বাঙালিয়ানার সত্তা এখনো মরেনি।
একসঙ্গে তৈরি হওয়া একটি বাস্তবতা
এবার শুরুর প্রশ্নে ফিরে আসি। বাঙালিয়ানা পরিচয় না সত্তা?
পরিচয় হলো বাইরে থেকে দেওয়া লেবেল - পাসপোর্টে লেখা, জনগণনায় টিক দেওয়া। কিন্তু সত্তা হলো ভেতর থেকে অনুভব করা অস্তিত্ব - যা অভিজ্ঞতায়, স্মৃতিতে, সম্পর্কে তৈরি হয়। আর প্লুরিভার্স বলছে, এই সত্তা একা তৈরি হয় না - এটা তৈরি হয় একসঙ্গে, পরস্পরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায়। বাঙালিয়ানাও তাই।
এটা না একা একজন বাঙালির সত্তা, না রাষ্ট্রের দেওয়া পরিচয়। এটা তৈরি হয় দুই বাংলার বাঙালির মধ্যে, প্রবাসী আর দেশের বাঙালির মধ্যে, শহর আর গ্রামের বাঙালির মধ্যে, মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের বাঙালির মধ্যে - এই সব সম্পর্কের জালে। ঠিক সেই প্রবাল প্রাচীরের মতো, যেখানে প্রতিটি প্রবাল আলাদা, কিন্তু সবাই মিলে একটি জীবন্ত, শ্বাসরত সত্তা তৈরি করে। একটি প্রবাল মারা গেলে পুরো প্রাচীর দুর্বল হয়। একটি কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেলে বাঙালিয়ানাও একটু ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তাই সংকট তখনই দেখা দেয় যখন বাঙালিয়ানা শুধু পরিচয়ের স্তরে আটকে থাকে। যখন মানুষ বাঙালি বলে পরিচয় দেয় কিন্তু বাংলা ভাষা চর্চা করে না, বাঙালি সাহিত্য পড়ে না, অন্য বাঙালির সংস্কৃতিকে সম্মান করে না। তখন বাঙালিয়ানা হয়ে ওঠে একটি ফাঁকা লেবেল বা মার্কা, পহেলা বৈশাখে শাড়ি পরা আর ইলিশ খাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ একটি আনুষ্ঠানিকতা, যার পেছনে কোনো জীবন্ত সত্তা নেই।
বাঙালিয়ানাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাকে অহংকারের বিষয় না করে কৌতূহলের বিষয় করতে হবে। ‘আমরা মহান’ এই দাবির বদলে প্রশ্ন করতে হবে, আমাদের বাঙালিয়ানায় কার কণ্ঠস্বর নেই? কোন গানগুলো মঞ্চে পৌঁছায়নি? কোন গল্পগুলো লেখা হয়নি? দুই বাংলা তথা বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে। রাষ্ট্রের বাইরে, ভিসার বাধার বাইরে, মানুষে মানুষে।
উৎসবের সময় দুই বাংলার মানুষ যখন একই সঙ্গে সেই আনন্দ উদযাপন করে - সেই মুহূর্তে কোনো সংজ্ঞার দরকার হয় না। বাঙালিয়ানা তখন না পরিচয়, না শুধুই সত্তা - সে তখন একটা অনুভব, একটা যৌথ নির্মাণ, একটা চলমান প্রক্রিয়া। হয়তো এটাই তার সবচেয়ে সত্যিকারের রূপ। তাম্পেরেতে বসে বাংলা গান শুনছে যে বাঙালি, বরিশালের রাস্তায় পহেলা বৈশাখে হাঁটছে যে কিশোরী, সুন্দরবনে রবীন্দ্রনাথ পড়ছে যে বৃদ্ধ - এরা সবাই এই যৌথ নির্মাণের অংশ। প্রত্যেকে বাঙালিয়ানাকে একটু একটু করে দেখছে, অনুভব করছে, বদলাচ্ছে, বাঁচিয়ে রাখছে। এটাই বাঙালিয়ানার প্রাণ - এটা চলতে থাকলেই বাঙালিয়ানা বেঁচে থাকবে, শুধু বইয়ের পাতায় নয়, মানুষের সত্তার গভীরে।