শৈশবের এক কোণে এখনও রয়ে গেছে কিছু রঙিন দৃশ্য — এক রাজা, দুজন অদ্ভুত সঙ্গীতশিল্পী, আর তাদের পাওয়া দুটি আশ্চর্য বর……’গুপী গাইন বাঘা বাইন’ শুধু একটা সিনেমা নয়, যেন কল্পনার দরজা খুলে দেওয়ার এক চাবিকাঠি। ছোটবেলায় গল্পটা পড়া বা সিনেমাটা দেখার পর অনেকেই একবার হলেও ভেবেছেন—আহা, যদি আমরাও এমন দুটো বর পেতাম! হাততালি দিলেই পছন্দের খাবার, সুন্দর পোশাক হাজির, আর সেই জাদুর জুতো পরে মুহূর্তেই পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া—কত সহজ, কত সুন্দর এক জীবন!

ভাবতে বসলে মনে হয়, এমন একটা পৃথিবী হলে আমাদের জীবন কতটাই না বদলে যেত। সকালে ঘুম থেকে উঠে কেউ আর তাড়াহুড়ো করে রান্না করতে যেত না, বাজারের লম্বা লিস্ট বানাতে হতো না। শুধু দুটো হাততালি আর সামনে হাজির হয়ে যেত গরম ভাত-ডাল, পছন্দের তরকারি, প্রিয় মাছের ঝোল, কিংবা হয়তো এক প্লেট বিরিয়ানি। শুধু নিজের নয়, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের যদি এই ক্ষমতা থাকত, তাহলে “ক্ষুধা” শব্দটাই হয়তো অভিধান থেকে হারিয়ে যেত। ক্ষুধার কষ্ট, না খেতে পেয়ে শিশুর কান্না—এসব হয়তো ইতিহাস হয়ে যেত।

কিন্তু খাবারের সঙ্গে সঙ্গে পোশাকের বিষয়টাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা কত সময়, কত শ্রম দিই শুধুমাত্র একটা ভালো পোশাকের জন্য। কখনো অর্থের অভাবে, কখনো সুযোগের অভাবে তা হয়ে ওঠে না। অথচ যদি এমন হতো যে মনের মতো একটা পোশাক ভাবলেই তা সামনে এসে হাজির হয় যেত, তাহলে কেউ আর নিজের অভাব নিয়ে লজ্জা পেত না, কেউ আর অন্যের চোখে ছোট হয়ে যেত না। এক অর্থে, মানুষের বাহ্যিক পার্থক্যগুলো অনেকটাই মুছে যেত।

তারপর তো আছেই সেই জাদুর জুতো। এখন কোথাও ভ্রমণ করা মানেই হল পরিকল্পনা, টাকা, সময় আর মাঝে মাঝে ভিসার বাধা-বিপত্তি। কিন্তু যদি শুধু হাততালি দিয়ে বলা যেত যে “আমি পাহাড়ে যেতে চাই”, আর মুহূর্তেই আমরা চলে যেতাম হয়তো বা এভারেস্টের শৃঙ্গে নাহলে সুইস আল্পস এ বা ধরুন কিলিমানজারো-ফুজিয়ামা তে! সকালে হয়তো কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায়, দুপুরে মায়ামির সৈকতে, আর সন্ধ্যায় কোনো অজানা দেশের নির্জন গলিতে হাঁটতে-হাঁটতে হটাৎ মোবাইলে ভেসে আসা অরোরা-বোরিয়ালিস এর এলার্টে ঝপ করে হাততালি দিয়ে নর্ডিকে চলে আসা—এ যেন এক অনন্ত স্বাধীনতার অনুভূতি।

এমন একটা পৃথিবী হলে মানুষজন বোধহয় এতটাই কাছাকাছি চলে আসত যে—“তুমি কোন দেশের?” এই প্রশ্নটাই হয়তো হাস্যকর হয়ে উঠত! দেশ, সীমানা—এইসব লাইন টানা মানচিত্রের ব্যাপারগুলো তখন আর খুব একটা গুরুত্ব পেত না। আজ এখানে তো কাল ওখানে, ঠিক অনেকটা ”হ য ব র ল” এর গেছোদাদার মতন—হাততালি দিলেই যদি এক নিমেষের মধ্যে প্যারিস, লন্ডন, কিংবা নিজের দেশের বাড়িতে পৌঁছে যাওয়া যেত, তাহলে হয়তো আর ভিসা- ইমিগ্রেশন এর ঝামেলা পোয়াতে হতো না! মানুষ তখন একে অপরকে আরও ভালোভাবে চিনতো, বুঝতো—কারণ দেখা করতে, গল্প করতে, একসাথে খেতে কোনো বাধাই যে আর থাকত না। আজ ইচ্ছে হলো তো ইতালির পাস্তা খেয়ে নাও, আবার আরেকটা হাততালিতেই জাপানের সুসি বা ফিনল্যান্ডের স্যামন স্যুপ সামনে প্রস্তুত—এমন সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান হলে আমাদের পেট আর মন, দুটোই ভরা থাকত! পৃথিবীটা তখন সত্যিই একটা “গ্লোবাল ভিলেজ” হয়ে উঠত, তবে শুধু বইয়ের পাতায় পড়া কোনো সিরিয়াস টার্ম হিসেবে নয় বরং একদম পাড়ার মোড়ের আড্ডার মতো যেখানে সবাই সবার চেনা।

কিন্তু………

সবকিছুরই একটা অন্য দিক তো থেকেই থাকে, কি বলেন?

যখন সবকিছু এত সহজলভ্য হয়ে যায়, তখন কি তার মূল্য আগের মতোই থাকে? আমরা প্রতিদিন যা আহার করি, তার পেছনে থাকে অনেক মানুষের শ্রম—কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম, রাঁধুনির যত্ন আর নিষ্ঠা। যদি এক তালিতেই সবকিছু আমাদের সামনে এসে হাজির হয়, তবে কি সেই পরিশ্রমের গভীরতাটা আমরা আর উপলব্ধি করতে পারব? সম্ভবত না। ধীরে ধীরে মানুষ সহজ প্রাপ্তির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে, আর অজান্তেই ‘কৃতজ্ঞতা’ শব্দটির গুরুত্ব ক্রমে ফিকে হয়ে যেতে থাকবে।

ভ্রমণের ক্ষেত্রেও একই কথা। আজ আমরা যে কোনো নতুন জায়গায় গেলে তার জন্য একটা আলাদা উত্তেজনা কাজ করে—দীর্ঘ যাত্রা, পথের ছোটখাটো ঝামেলা, অজানা অভিজ্ঞতা, আর ধীরে ধীরে সেই জায়গাটাকে নিজের মতো করে আবিষ্কার করা। ট্রেনের বা গাড়ির জানালা দিয়ে পাল্টে যাওয়া দৃশ্য, রাস্তায় হঠাৎ থেমে চা-কফি খাওয়া, পথ হারিয়ে আবার ঠিক রাস্তা খুঁজে পাওয়া—এসব ছোট ছোট মুহূর্তই তো ভ্রমণকে মনে রাখার মতো করে তোলে। কিন্তু যদি মুহূর্তেই পৌঁছে যাওয়া যায় এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত, সেই যাত্রার আনন্দটা কি আর থাকবে? নাকি সবকিছুই খুব তাড়াতাড়ি, খুব সহজ হয়ে গিয়ে একসময় একঘেয়ে লাগতে শুরু করবে? হয়তো আমরা তখন গন্তব্যে পৌঁছব ঠিকই, কিন্তু পথটার সঙ্গে যে এক অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়, সেটাই আর গড়ে উঠবে না। ভ্রমণ তখন শুধু “পৌঁছে যাওয়া”-র মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে, “যাওয়া”-র আনন্দটা হারিয়ে যাবে।

সবচেয়ে বড় কথা হল যে মানুষ হয়তো নিজের সীমাবদ্ধতাগুলো ভুলে যাবে। আমাদের জীবনের সৌন্দর্য অনেকটাই লুকিয়ে আছে এই অসম্পূর্ণতায়—সবকিছু না পাওয়ার মধ্যেও একটা তৃপ্তি আছে, একটা খোঁজ আছে। সেই খোঁজটাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। এই অপূর্ণতাই আমাদের নতুন কিছু শিখতে, চেষ্টা করতে, আর বারবার ব্যর্থ হয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে শেখায়। যদি সবকিছু খুব সহজেই পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো চেষ্টা করার আগ্রহটাই ধীরে ধীরে কমে যেত। আমরা যে স্বপ্ন দেখি, তার পেছনে ছুটে চলার যে উত্তেজনা—সেটাই আসলে আমাদের জীবনকে অর্থ দেয়।

তবুও, “যদি এমনটি হতো” এই ভাবনাটা কখনই যেন পুরোনো হয় না। এটা আমাদের কল্পনাকে ডানা দেয়, আমাদের বাস্তবের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভাবতে শেখায়। হয়তো আমরা জানি, এমনটা কোনোদিনই সত্যি হবে না—তবুও এই কল্পনাই আমাদের গল্প লিখতে শেখায়, গান গাইতে শেখায়, নতুন কিছু ভাবতে সাহস দেয়।

শেষমেশ মনে হয়, হয়তো আমাদের সেই ভুতের রাজার বর নেই ঠিকই, কিন্তু আমাদের কল্পনাশক্তি তো আছে—আর সেটাই তো আসল বর। আমরা চাইলে কল্পনার ভেতরেই হাজারটা পৃথিবী তৈরি করতে পারি, যেখানে ক্ষুধা নেই, কষ্ট নেই, দূরত্ব নেই।

তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, কোনো এক রোদ জ্বলা দুপুরে বা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়—
একটু হাততালি দিলে যদি সত্যিই সবকিছু সহজ হয়ে যেত…

সত্যিই……………যদি এমনটি হতো।