ইথিওপিয়ার দক্ষিণে , সভ্যতার মানচিত্রের একেবারে প্রান্তে আছে এক জায়গা - Omo Valley। পৃথিবীর খুব কম জায়গার মধ্যে এটি এমন এক এলাকা যেখানে এখনও মানুষ হাজার হাজার বছর আগের জীবনযাপন, বি শ্বাস, সংস্কৃতি নিয়ে টিকে আছে । এখানে গেলে মনে হয়, টাইম মেশিনে চড়ে আমরা অতীতে চলে গেছি ।
এই উপত্যকার মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে Omo River। এই নদীই এখানকার জীবনের মূল অঙ্গ। বৃষ্টি কম, মাটি শুকনো , চারপাশে ধুলো , কাঁটাগাছ, খরার মতো পরিবেশ। তবু এই কঠিন প্রকৃতির মাঝেই টিকে আছে একের পর এক উপজাতি একেবারে নিজেদের নিয়মে, নিজেদের পৃথিবীতে ।
এই ওমো ভ্যালিতে ১৬ - ১৭টি আলাদা ট্রাইব থাকে । তাদের ভাষা আলাদা, পোশাক আলাদা , রীতি-নীতি আলাদা, কিন্তু প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানই করেই তাদের সবার জীবন চলছে । আমরা পৌঁছেছিলাম বহু দূরের কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে । ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়ি, ধুলো, ঝাঁকুনি, সভ্যতার কোনো চিহ্ন নেই। মনে হচ্ছিল, কোথায় যাচ্ছি ! কিন্তু পৌঁছানোর পর বুঝলাম, এই কষ্টটা সার্থক ।প্রথমেই আমরা গেলাম Mursi Tribe-এর গ্রামে।
মুরসি ট্রাইব ঠোঁটে র প্লেট আর গর্বের সৌন্দর্য
মুরসি মহিলাদের ঠোঁটে বড় গোল মাটির প্লেট। প্রথম দেখায় অবাক লাগে । অস্বস্তিও লাগে । কিন্তু একটু সময় কাটালেই বোঝা যায়, এটা তাদে র কাছে গর্ব, সৌন্দর্য, পরিচয়। কিশোরী বয়সে তাদের নিচের ঠোঁট কেটে ধীরে ধীরে বড় করা হয়, তারপর সেই জায়গায় মাটির প্লেট বসানো হয়। প্লেট যত বড়, মেয়েটিকে তত সুন্দর ধরা হয়। এটা তাদের সামাজিক মর্যাদা , বিয়ের মূল্য , সম্মানের প্রতীক। আমরা যখন তাদের সামনে দাঁড়ালাম, তারা আমাদে র দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে । কেউ হাসছে , কেউ আবার একদম নির্বিকার। মনে হচ্ছিল, আসলে আমরা তাদের কাছে অদ্ভুত। ওদের শরীরে রঙ দিয়ে আঁকা নকশা, গলায় পুঁতির মালা , মাথায় অদ্ভুত সাজ। আর চারপাশে কাদা মাটির ছোট গোল কুঁড়ে ঘর। কোনো বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল নেই, আধুনিক কিছুই নেই। তাদের জীবন গবাদি পশু, জল, খাবার, পরিবার, আর ট্রাইব ঘিরে ।
বেনা ট্রাইব শরীরই ক্যানভাস
তারপর আমরা গেলাম Bena Tribe-এর কাছে । এদের শরীরটাই যেন একটা আর্ট গ্যালারি । মাটি, ছাই রং দিয়ে শরীরে এমন নকশা করে যে মনে হয় কোনো শিল্পী বসে কাজ করেছে । তারা খুব বন্ধুভাবাপন্ন। আমাদের দেখে হাসছি ল, কথা বলছিল, ছবি তুলছিল । তাদের জীবনও একইরকম সরল, কিন্তু তাদে র মধ্যে একটা আনন্দ, একধরনের প্রাণশক্তি আছে । লম্বা লাঠি নিয়ে হাঁটা ছেলেরা এদের ঐতিহ্য । আমরা দেখলাম কিছু ছেলে লম্বা কাঠের লাঠির ওপর ভর দিয়ে হাঁটছে । যেন মাটি ছুঁয়েই না । এই লাঠি নিয়ে হাঁটা শুধু খেলা নয়। এটা তাদের ঐতিহ্য , দক্ষতার পরিচয়। গবাদি পশুর উপর নজর রাখা , দূর থেকে দেখা , দ্রুত চলাফেরা এই লাঠিই তাদের সঙ্গী । দূর থেকে যখন দেখছিলাম, মনে হচ্ছিল কোনো সিনেমার দৃশ্য চলছে ।
ডোরজে ট্রাইব - পাহাড়ের মানুষ
আমরা দেখলাম Dorze Tribe-এর মানুষদেরও। তাদের বাড়ি গুলো বাঁশ আর খড় দিয়ে বানানো , দেখতে হাতির মতো । পাহাড়ি অঞ্চলে থাকে । তুলো চাষ করে , কাপড় বোনে । ওদের গ্রামে একটা শান্ত, গুছানো জীবন ।
ওমো ভ্যালিতে দাঁড়িয়ে বারবার মনে হচ্ছিল আমরা কোনো অন্যরকম পৃথিবী থেকে এসেছি । এখানে সময় থেমে আছে । এখানে মানুষ প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে না , মানিয়ে নেয়। আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি , অনেক কষ্ট করে পৌঁছেছি । কিন্তু যখন মুরসি মহিলার ঠোঁটে র প্লেটে র দিকে তাকালাম, বেনাদের শরীরের আর্ট দেখলাম, হামার ছেলেদের লাঠির উপর ভর দিয়ে হাঁটা দেখলাম মনে হল, পৃথিবী কত বৈচিত্র্যময়! তাদের কাছে আমরা পর্যটক। আমাদের কাছে তারা ইতিহাস। কিন্তু কিছুক্ষণ পর মনে হল, আসলে আমরা সবাই মানুষ। শুধু জীবনযাপনের পথ আলাদা ।
ওমো ভ্যালি আমাদের শিখিয়েছে , সভ্যতা মানে ই উন্নত প্রযুক্তি নয়। সভ্যতা মানে নিজের সংস্কৃতি কে বাঁচিয়ে রাখা । এই ভ্যালি থেকে বেরিয়ে আসার পর মনে হচ্ছিল, যেন এক অন্য গ্রহ থেকে ফিরলাম। ধুলো মাখা পথ, কাঁচা রাস্তা , গরম হাওয়া , আর মানুষের সেই সহজ জীবন সব মিলিয়ে এক অভিজ্ঞতা, যা বইয়ে পড়ে বোঝা যায় না , ভিডিওতে দেখেও বোঝা যায় না । এটা শুধু ভ্রমণ ছিল না , এটা ছিল মানুষের ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানো ।