মুখবন্ধ মানে তো মুখ বন্ধ নয়, তাই মনে আসা দু-একটা কথা বলেই ফেলা যাক! পরিবর্তন এর হাওয়ায় বাঙালি রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করতেই ভুলে যাবে? তাও কখনো হয়? হয়তো দেশে সম্ভব, কিন্তু বিদেশে নয় - আমাদের প্রবাসী মনের ক্ষেত্রে রবি-ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি নজরুল কে ভুলে থাকা সম্ভব নয় - আমরা এদের নিয়েই তো প্রবাসে বেঁচে আছি! আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এদের লেখার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
আমরা আজ পৃথিবীর সর্বত্র জাতীয়তাবাদের ধোয়া উড়তে দেখছি, আমেরিকা থেকে ইউরোপ - দেশে দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদের হুঙ্কারে আজ পৃথিবীতে মনুষত্ব নতজানু! আমার দেশ ও থেমে থাকেনি এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র ধর্মান্ধতার পরিবেশে পরাক্লান্ত আমার দেশও। রবি ঠাকুরের লেখায় - “তথাকথিত স্বাধীন দেশগুলিতে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ স্বাধীন নয়, তারা সংখ্যালঘুদের দ্বারা এমন এক লক্ষ্যের দিকে চালিত হয় যা তাদের কাছে অজানা।” তবুও, এই সংখ্যাগরিষ্ঠরা “তাদের আবেগ দিয়ে বিশাল ঘূর্ণি তৈরি করে এবং তাদের সেই ঘূর্ণায়মান গতির বেগে তারা মাথাঘোরা অবস্থায় মত্ত থাকে, আর একেই স্বাধীনতা বলে ধরে নেয়”। জাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা মনুষ্যত্বের পরিপন্থী - আর রবীন্দ্রনাথ শুধুই মানুষের মনুষ্যত্বের ওপর জোর দিয়েছিলেন তার লেখায়।
“মানুষের ধর্ম” তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন - "আমাদের অন্তরে এমন কে আছেন যিনি মানব অথচ যিনি ব্যক্তিগত মানবকে অতিক্রম ক’রে “সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ’। তিনি সর্বজনীন সর্বকালীন মানব। তাঁরই আকর্ষণে মানুষের চিন্তায় ভাবে কর্মে সর্বজনীনতার আবির্ভাব।… সেই মানুষের উপলব্ধি সর্বত্র সমান নয় ও অনেক স্থলে বিকৃত ব’লেই সব মানুষ আজও মানুষ হয় নি”। “এই মনুষ্যত্ব বাঁচানোর দ্বন্দ্ব মানবধর্মের সঙ্গে পশুধর্মের দ্বন্দ্ব, অর্থাৎ আদর্শের সঙ্গে বাস্তবের।… পশু বলছে, “সহজধর্মের পথে ভোগ করো।” মানুষ বলছে, “মানবধর্মের দিকে তপস্যা করো।” যাদের মন মন্থর – যারা বলে, যা আছে তাই ভালো, যা হয়ে গেছে তাই শ্রেষ্ঠ, তারা রইল জন্তুধর্মের স্থাবর বেড়াটার মধ্যে; তারা মুক্ত নয়, তারা স্বভাব থেকে ভ্রষ্ট।” রক্তকরবী-তে কবি লিখেছেন - “আমার অস্ত্র নেই, আমার অস্ত্র মৃত্যু।” - এর প্রত্যক্ষ প্রমান পৃথিবী দেখছে মধ্য-প্রাচ্যে রোজ নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুতে, মানুষের পশুত্বে পরিণতিতে।
কবিদের দেখা মনুষত্ব আজ পথভ্রষ্ট। আমরা মানুষই মনুষত্বের ধর্মত্যাগী! নজরুল এর ভাষায় - “একটা ধর্ম কখনো সঙ্কীর্ণ, অনুদার হইতে পারে না। ধর্ম সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং সত্য চিরদিনই বিশ্বের সকলের কাছে সমান সত্য। কোন ধর্ম শুধু কোন এক বিশিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য নয়। তাহা বিশ্বের।”
তাই যখন জাত-ধর্ম বিশেষ আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে প্রাধান্য পায়, তখন প্রয়োজন এই দুই কবি লেখা স্মরণ করা। প্রয়োজন বুক চিতিয়ে বলার -“হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কান্ডারি! বলো ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।”
আমরা ফিনল্যাণ্ডএ বসবাসকারীরা ইউরোপেও প্রবল উগ্র ডানপন্থী শক্তির উত্থানের সাক্ষী। ইউরোপ এর যা অবস্থা, তা হুবুহু কবিগুরুর লেখার সাথে মিলে যায় - "য়ুরোপীয় সভ্যতার মূলভিত্তি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ যদি এত অধিক স্ফীতিলাভ করে যে, ধর্মের সীমাকে অতিক্রম করিতে থাকে, তবে বিনাশের ছিদ্র দেখা দিবে এবং সেই পথে শনি প্রবেশ করিবে। স্বার্থের প্রকৃতিই বিরোধ। য়ুরোপীয় সভ্যতার সীমায় সীমায় সেই বিরোধ উত্তরোত্তর কণ্টকিত হইয়া উঠিতেছে। পৃথিবী লইয়া ঠেলাঠেলি কাড়াকাড়ি পড়িবে, তাহার পূর্বসূচনা দেখা যাইতেছে। …“জোর যার মুলুক তার’ এ নীতি স্বীকার করিতে আর লজ্জা বোধ করিতেছে না… রাষ্ট্রতন্ত্রে মিথ্যাচরণ সত্যভঙ্গ প্রবঞ্চনা এখন আর লজ্জাজনক বলিয়া গণ্য হয় না।”
অন্যদিকে বিদ্রোহী কবি নজরুল এর লেখায় - “গাহি সাম্যের গান— মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক। লিখেছেন - “মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।”
এনারা মানুষকে ভালোবেসেছিলেন ও মনুষত্বের জয়গান করে গেছেন লেখায়, জীবনে। রবীন্দ্র-নজরুল জন্মবার্ষিকী পালন করা তাই আমাদের কর্তব্য - পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার সম্পূর্ণতা প্রদান ও অভিভাবক হিসেবে গুরুদায়িত্বের পালন! প্রয়োজন চোখ খুলে সমাজকে দেখা, নিজেদের দায় না এড়িয়ে প্রশ্ন করা। শিল্প, সাহিত্য, অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেদের ভাব ব্যক্ত করা - প্রয়োজন কবিগুরু ও বিদ্রোহী কবির অনবদ্য সৃষ্টির আঙ্গিকে নিজেদের সমৃদ্ধ করা!
সুভাষচন্দ্র বসু, নজরুল স্মৃতি-তে লিখেছিলেন - “কবি নজরুল যে-স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটা শুধু তার নিজের স্বপ্ন নয় —সমগ্র বাঙালী জাতির স্বপ্ন।”
তাই, বিদ্রোহী কবির স্বপ্নকে বুকে নিয়ে চলাই আমাদের ভবিষ্যতের পাথেয় - স্ব-বাসে, পর-বাসে, মনুষ্য-ধর্ম প্রতিষ্ঠার রণে - কাজী নজরুলের চিন্তায় -
“মহা– বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না,
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত!”
সৃজন-এর সৃষ্টি-সুখের উল্লাস তাই বসন্তের আবির্ভাবে প্লাবিত - কবিতা, গল্প, ছবি, লেখা - কবিগুরুর স্বপ্নে দেখা, বিদ্রোহীর বিপ্লব-মাখা।
মনুষত্বের পরিচয়ের ত্রুটি মার্জনীয়! 🙏
ইন্দ্র
২৭.০৫.২০২৬